ফুটবল মাঠে যখন শিল্পের ছোঁয়া লাগে, তখন তা আর কেবল খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে কবিতা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে উপমহাদেশের ফুটবল আকাশে এমনই এক ধ্রুবতারা হয়ে উদিত হয়েছিলেন সৈয়দ আবদুস সামাদ। যাঁকে দুনিয়া চেনে 'ফুটবল জাদুকর' হিসেবে। আজ ২ ফেব্রুয়ারি এই মহানায়কের মৃত্যুবার্ষিকী।
জন্ম ও শেকড়ের টানে ১৮৯৫ সালের ৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের ভুরী গ্রামে জন্ম নেওয়া এই ফুটবল প্রতিভা দেশভাগের পর নাড়ির টানে থিতু হয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পার্বতীপুরে। জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এই জনপদকেই ভালোবেসে আঁকড়ে ছিলেন তিনি।
মাঠ যখন জাদুকরের মঞ্চ ১৯১২ সালে কলকাতা মেইন টাউন ক্লাবে শুরু, আর ১৯৩৩ সালে মোহামেডানে যোগ দিয়ে ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। সামাদের নেতৃত্বে মোহামেডান টানা পাঁচবার আইএফএ শিল্ড ও লীগ জয়ের গৌরব অর্জন করে।
১৯২৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেক এবং ১৯২৬ সালে অধিনায়কত্বের ব্যাটন হাতে নিয়ে তিনি চষে বেড়িয়েছেন চীন থেকে ইংল্যান্ড, সুমাত্রা থেকে মালয়। চীনের বিপক্ষে ৩-০ তে পিছিয়ে থেকেও সামাদের অতিমানবীয় চার গোলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় আজও রূপকথার মতো শোনায়।
এক নির্ভুল জ্যামিতিক প্রতিভা সামাদের পা ছিল যেন এক অদৃশ্য স্কেল। একবার ইন্দোনেশিয়ার জাভায় তাঁর জোরালো শট গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে তিনি খেলা থামিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন—"গোলপোস্টের উচ্চতা কম!" মেপে দেখা গেল সত্যিই তা আন্তর্জাতিক মাপের চেয়ে চার ইঞ্চি নিচু ছিলো।
এই নিখুঁত মাপজোখ আর আত্মবিশ্বাসই তাঁকে 'জাদুকর' উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। সামাদের ক্রীড়াশৈলী দেখে মুগ্ধ স্কটিশ ফুটবলবোদ্ধারা বলেছিলেন, "সামাদ যদি ইউরোপে জন্মাতেন, তবে তিনি হতেন পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ফুটবলার।" এমনকি ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত ফুটবলার এলেক হোসি অকপটে স্বীকার করেছিলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রথম সারির দলে খেলার যোগ্যতা ছিল সামাদের। সে সময় জমিদাররা তাকে 'খেপ' খেলতে নিয়ে যেতেন। সামাদ আগেভাগে জিজ্ঞেস করতেন, "কয়টা গোল দেব?" আর ঘড়ির কাঁটা ধরে শেষ ১০ মিনিটে ঠিক সেই কটি গোলই উপহার দিতেন দর্শকদের।
১৯৩৬ সালে এক মারাত্মক চোট সামাদের ছন্দময় ক্যারিয়ারে যবনিকা টেনে দেয়। ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এই চিরসবুজ ফুটবলার শিল্পী বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। তাঁর অবসরের পর বহু ফুটবলপ্রেমী দুঃখে মাঠে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন।
আজকের আধুনিক ফুটবলের চাকচিক্যে আমরা কি মনে রেখেছি আমাদের এই ভূমিপুত্রকে? যিনি বুট জুতো ছাড়াই ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন উপমহাদেশের ফুটবলের আত্মসম্মান ও শৌর্যের প্রতীক। এই ফুটবলের জাদুকরকে এখন আর মনে রাখে না কেউ। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয়ভাবে নেই কোনো আয়োজন, নেই কোনো স্মরণসভা। সামাদ যে মাটিতে শুয়ে আছেন, সেই পার্বতীপুরে এক সময় সামাদকে স্মরণকে করা হলেও এখন কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, পার্বতীপুরের এক সময়ের সাবেক ফুটবলার শরিফুল ইসলাম চঞ্চল জানান, সামাদের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে পার্বতীপুরে তাঁর স্মরণে তেমন কোনো আয়োজন তার চোখে পড়ে না, এটাকে তিনি দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। চঞ্চল বলেন, এই প্রজন্ম জাদুকর সামাদের নাম জানে না। তারা যখন এই নাম শোনে অবাক হয়। সামাদের নাম প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পৌঁছাতে এখনই বড় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জাদুকর সামাদ যে পার্বতীপুরে রেলের যে কোয়ার্টারে থাকতেন সেখানে এখন অন্য কর্মচারী পরিবার নিয়ে থাকেন। তবে পার্বতীপুরের স্থানীয়রা মনে করেন এই বাড়িটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, কেননা এটি ইতিহাসের একটি অংশ।
এ বিষয়ে মোস্তাকিম সরকার বলেন, তাঁর বসবাসরত বাড়িটিতে বর্তমান রেল বিভাগের কর্মচারীরা থাকেন। এটাকে যেমন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তেমনই সামাদের নামে যে ইনস্টিটিউট রয়েছে তা সংস্কার করে এই জাদুকরের স্মৃতি ধরে রাখতে হবে আমাদের।
জাদুকর সামাদের মাজার রয়েছে পার্বতীপুর শহরের ইসলামপুরে, এটাকেও নিয়মিত তদারক করা ও এখানে দর্শনার্থীদের দেখতে যাওয়ার সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মোস্তাকিম সরকার।
Publisher & Editor