শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫

ইসরায়েলে কেন ‘কখনো আর নয়’ ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ

প্রকাশিত: ১৩:০৪, ২৯ আগস্ট ২০২৫ |

ইসরায়েল যখন গাজায় সম্প্রসারিত সামরিক অভিযান চালিয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে, তখন দেশের ভেতরেই বিরোধিতার স্রোত জোরদার হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে গত শনিবার তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলোর একটি।

ইসরায়েলের পুলিশ আগে থেকে অনুমতি নেওয়া এই মিছিলের অনুমোদন বাতিল করে দিয়েছিল। আমাদের মতো বিরোধীদের কণ্ঠস্বর তারা যে নীরব করে দিতে চায়, এটা ছিল তার সুস্পষ্ট চেষ্টা। কিন্তু আমরা তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে দিইনি।

এর এক দিন আগে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)’ গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে এবং পরিকল্পিতভাবে না খাইয়ে মেরে ফেলার ইসরায়েলের ভয়াবহ নীতি ফাঁস করে। এ অবস্থায় অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব।

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা গাজা সিটি ‘পুনর্দখলে’ নেওয়ার প্রস্তাব পাস করার পর ইসরায়েলের সেনাবাহিনী তাদের রিজার্ভ থেকে ৬০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের আদেশ দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেটি কার্যকর হলে রিজার্ভের সদস্যসংখ্যা হবে ১ লাখ ৩০ হাজার। এটি যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। কিন্তু ইসরায়েলে সেনাসদস্যের সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, যুদ্ধ প্রত্যাখ্যানের আন্দোলনও বেড়ে চলেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কূটচালের বিরুদ্ধে নতুন করে অমান্যতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আলোচনায় বা প্রকাশ্য আলোচনায়, আরও বেশিসংখ্যক ইসরায়েলি এই উপলব্ধিতে আসছেন যে সেনাবাহিনীর সেবা করা মানে সরকারের অপরাধের দোসর হওয়া।

আন্দোলনটি কিন্তু মোটেই একমাত্রিক নয়। এই আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের বয়স, সামাজিক অবস্থান, উদ্দেশ্য বা মতাদর্শে ভিন্নতা রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ‘মেসারভত’ গোষ্ঠীর কিশোরেরা। তারা প্রকাশ্যেই ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্রের অংশ হতে প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত কঠোর আচরণ করা হয়েছে। তাদের বারবার সামরিক কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। এসব কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে আমি নিজে এই সব সাহসী কিশোরের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

আরও অনেকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মনে মনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা ঠিক কত, তার পরিসংখ্যান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আছে এবং সে তথ্য তারা প্রকাশ করনি। কিন্তু সেনাবাহিনীতে যুক্ত না হওয়ার জন্য ছাড়পত্র পেতে সাহায্য করে এমন একটি সংস্থা ‘ইয়েশ গ্ভুল’ বলছে, এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি হারেৎসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে সেনাবাহিনীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা মানুষের প্রতি সমর্থন উল্লেখযাগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, এই প্রত্যাখ্যান শুধু যৌক্তিক নয়, গাজায় থাকা জিম্মিদের জীবন রক্ষার জন্যও এটা প্রয়োজনীয়।

সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার ডাক প্রত্যাখানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ার নৈতিক আপত্তি, সামগ্রিকভাবে দখলদারত্বের রাজনৈতিক বিরোধিতা, সামরিক অভিযানের ফলে জিম্মিদের নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ার উদ্বেগ এবং বিভিন্ন অতিরক্ষণশীল গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়ায় অসন্তোষ।

মানবতার মৌলিক ধারণায় একত্র হয়ে শনিবার হাজার হাজার আরব ও ইহুদি একসঙ্গে ক্ষুধা, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীরা গাজার অনাহারী মানুষ ও বোমাবর্ষণে আহত শিশুদের ছবি তুলে ধরেন। তাঁরা জানেন যে গাজার বাসিন্দাদের দুর্বিষহ যন্ত্রণার জন্য যারা দায়ী, তারা এখন ক্ষমতায় রয়েছে।

আমরা দাবি জানিয়েছি, ইসরায়েলি হোক আর ফিলিস্তিনি হোক, সব জিম্মি ও আইনবিরুদ্ধভাবে আটকে রাখা বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। আমরা একটি রাজনৈতিক চুক্তির দাবি জানিয়েছি, যাতে ইসরায়েল সরকার গাজা থেকে সব সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে।

কিন্তু গাজায় আরেক দফা বোমাবর্ষণের খবরের পর সমাবেশ থেকে আমাদের যে ব্যানার, সেখানে স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘কখনোই আর নয়’। হত্যাযঞ্জের শিকার হওয়া শিশু ও অনাহারে থাকা পরিবারগুলো নিয়ে আমরা আর কখনো চুপ থাকব না। নেতানিয়াহু যখন আমাদের প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি, বসতি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে এবং হাসপাতালে আক্রমণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন আর আমরা নীরবে দেখব না। জিম্মিদের মুক্তি দিতে পারে, এমন চুক্তি আর আমরা প্রত্যাখ্যান করতে দেব না। আর কখনো গাজায় গণহত্যা হতে দেব না।

পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে ‘কখনো আর নয়’ শব্দের বিশেষ তাৎপর্য আমার কাছে আছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবজাতি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে আর কখনো এমন নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি তারা হতে দেবে না।
হলোকাস্ট; ইহুদিদের গণহত্যা, নিষ্টুর অত্যাচারের সব সীমা ছুঁয়েছিল। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানকে সর্বজনীন কর্তব্য বলে মনে করি।

১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সনদ গ্রহণ করেছিল। গত কয়েক দশকে এই অমূল্য সত্যের সুরক্ষা দিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি। গাজায় যে চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে চলেছে, সেটা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। এই বাস্তবতায় ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানটি কেবল নৈতিক স্মরণ নয়, বরং নৈতিকভাবে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

প্রচলিত আছে, ‘একবার আমাকে ঠকালে দোষ তোমার, দ্বিতীয়বার ঠকালে দোষ আমার’। কিন্তু নেতানিয়াহু বারবার পশ্চিমা নেতাদের প্রতারিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। শুক্রবার আইপিসি গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, এটি ‘সম্পূর্ণরূপে ভয়ানক ও পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor