সাগরের নিচে থাকে হরেক রকমের মজার ও অদ্ভুত প্রাণী। তার মধ্যে রহস্যময় প্রাণী হাঙর। কিছুটা ভয়ংকরও। সবচেয়ে চেনা আর ভীতিকর নাম হোয়াইট শার্ক বা শ্বেতহাঙর। সিনেমা, বই আর কার্টুনে এই হাঙরকে দেখে তোমরাও হয়তো ভয় পেয়েছ। শ্বেতহাঙরের ভয়াল কাণ্ডকারখানা নিয়ে এক 'জস'[Jawz]’নামে সিনেমা হয়েছে কয়েকটি। লিখেছেন শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া
তোমরা কী জানো, দুনিয়ায় হাঙর আছে ৪৪০ রকমের। এদের বেশিরভাগই কিন্তু মানুষকে আক্রমণ করে না। বরং নিজেদের মতো সাঁতার কাটে আর খাবারের সন্ধান করে বেড়ায়। সব মহাসাগরেই হাঙর রয়েছে।
কিছু হাঙর পানির উপরিভাগে বিচরণ করে। কিছু থাকে আরেকটু গভীরে। সাগরের তলদেশেও থাকে কিছু। হাঙরের ইতিহাসও অনেক পুরনো।
জানলে অবাক হবে, পৃথিবীতে হাঙর রাজ্যের রহস্যহাঙরের আগমন ঘটেছে ডাইনোসরেরও আগে। হাঙরের দাঁতের এমন সব জীবাশ্ম পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যেগুলোর বয়স ৪০ কোটি বছরেরও বেশি।
নানা আকৃতির হাঙরের দেখা মেলে। কোনোটার আকার বড়সড় বাসের চেয়েও বিশাল।
আবার কোনোটা আমাদের হাতের চেয়ে একটু বড়। বেশির ভাগ হাঙর দেখতে টর্পেডোর মতো হলেও কিছু আবার ভিন্ন আকৃতির। সবচেয়ে বড় হাঙরের নাম তিমিহাঙর বা হোয়েল শার্ক। মাছের মধ্যেও এটি সবচেয়ে বড়। নাম শুনে আবার ভয় পেয়ো না।
আকারে বড় হলেও এরা একদমই শান্ত স্বভাবের। সচরাচর কাউকে আক্রমণ করে না। এদের খাবার এক ধরনের ক্ষুদ্র জলজ জীব, যেগুলো প্লাঙ্কটন বলে পরিচিত। খাওয়ার সময় হলে মুখটা হাঁ করে সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে যায়। এ সময় এদের মুখের ভেতর ঢুকে যেতে থাকে প্লাঙ্কটন। ফুলকা দিয়ে পানি ঝরিয়ে গিলে ফেলে এসব খাবার।
তবে বেশির ভাগই এতো শান্ত নয়। অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করে খায় তারা। শিকারকে ঘায়েল করে দাঁত দিয়ে। এদের দাঁতের আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাঘ-ভালুকের মতো হিংস্র শিকারি প্রাণীর কেবল দুই পাটি দাঁত থাকে। এ ধরনের বেশির ভাগ শিকারি প্রাণীর দাঁত কোনোভাবে একবার পড়ে বা ঝরে গেলে সাধারণত আর গজায় না। কিন্তু শ্বেতহাঙরসহ অন্যান্য শিকারি হাঙরের ওপর-নিচের মাড়িতে কয়েক সারি দাঁত থাকে। দাঁতগুলো খুদে করাতের মতো খাঁজকাটা। এসব দাঁত দিয়ে অতিকায় সামুদ্রিক প্রাণীকেও কুপোকাত করে ফেলে এরা। যত পিচ্ছিল প্রাণীই হোক, হাঙরের দাঁতে আটকে গেলে আর রক্ষে নেই। আর এক কামড়েই কম্ম সারা। ভাবছ, দাঁত পড়ে গেলে কী হবে? সমস্যা নেই, আবার নতুন করে গজাবে।
হাঙরের ঘ্রাণশক্তিও প্রখর, যা শিকার ধরার ক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগে। বিশেষ করে রক্তের গন্ধ পেলে এরা খুব উতলা হয়ে ওঠে। আমরা তো নাক দিয়ে শ্বসনকাজ চালাই। কিন্তু হাঙর? ওদের নাসারন্ধ্রের একমাত্র কাজ ঘ্রাণ নেওয়া। শ্বসনকাজ চালায় ফুলকার মাধ্যমে। হাঙরের লম্বা নাকে আছে অসংখ্য খুদে ছিদ্র। যেগুলো দিয়ে হাঙর বুঝতে পারে শিকার কোথায় কী অবস্থানে আছে। এমনকি শব্দও খুব ভালো শোনে হাঙর। পানির নিচে ৮০০ ফুট দূর থেকেও শিকারের নড়াচড়া বুঝতে পারে কিছু হাঙর। হাঙরের শরীরের দুই পাশে এমন পার্শ্বরেখা রয়েছে, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র রন্ধ্র রয়েছে। এর মাধ্যমে শিকারের স্পন্দন বুঝতে পারে এরা।
হাঙর রাজ্যের রহস্য
হাঙরের রয়েছে প্রখর ঘ্রাণশক্তি, যা শিকার ধরার ক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগে
তবে সব হাঙর একরকম নয়। যেমন ধরো—অ্যাঞ্জেল শার্ক। দেখতে এরা চ্যাপটা। সাগরের তলদেশে বালুর মধ্যে শরীর গুঁজে চুপটি করে অপেক্ষায় থাকে শিকারের জন্য। পছন্দের কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী নাগালে এলেই বালু থেকে ভুশ করে বেরিয়ে আসে। নিমেষে ঘপাৎ করে খেয়ে ফেলে। সব হাঙরই যে সাঁতার কেটে বেড়ায়, তা নয়। যেমন—নার্স শার্কের কথাই ধরো না। বেশির ভাগ সময় সাগরের তলদেশে স্থির থাকে এরা। পাখনাগুলো তারা সামনে-পেছনে নড়াচড়ায় ব্যবহার করে।
হাঙর রাজ্যের রহস্য
খাওয়ার সময় হলে হোয়েল শার্ক মুখ হাঁ করে সাঁতরে যেতে থাকে
তোমরা কি জানো, বেশির ভাগ হাঙর সরাসরি বাচ্চা দেয়। কিছু আবার ডিমও পাড়ে। তবে মা হাঙর তার পোনার যত্ন নেওয়ার কোনো ধার ধারে না। পোনাটিও যখন মায়ের পেট থেকে বেরোয়, স্রেফ সাঁতার কেটে একদিকে চলে যায়। নিজের মতো করে বড় হতে থাকে সে। যেসব হাঙর ডিম পাড়ে, সেগুলো দেখতে অনেকটা চামড়ার থলের মতো। কেউ কেউ এগুলোকে ‘মৎস্যকন্যার পার্স’ বলে। এর মধ্যে কুসুম থাকে, যা খেয়ে হাঙরের পোনা বড় হয়। একসময় যখন পোনাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়, তখন থলে থেকে বেরিয়ে নিজের মতো করে সাঁতরে চলে যায় যেদিকে তার ইচ্ছা সেদিকে।
তথ্যসূত্র : রেঞ্জার রিক
Publisher & Editor