এ রকম একটি কথা শোনার পর আর ঘুম আসে বুঝি! উত্তেজনা, কৌতূহলে ঘুমাতে পারছেই না মৌ ও রাকেশ। ওরা পিঠাপিঠি ভাই-বোন। মৌ দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, রবীন্দ্রসংগীত গায়। রাকেশ এখনো স্কুলেই যায়নি।
তাই বলে সে গানবাজনা করে না, তা কিন্তু নয়! মৌয়ের পাশে বসে আবোলতাবোল গিটার বাজায়, হুম! মৌ, রাকেশকে নিয়ে প্রায় প্রায়ই ওদের বাবা ভ্রমণে বের হন। ওদের সঙ্গে নিয়ে সক্কাল সক্কাল সদরঘাটে লঞ্চ দেখতে যাওয়া, ঘরের বাজার করতে যাওয়া, পূজায়, ঈদে এদিক-ওদিক বেড়াতে যাওয়া—এসব মৌ, রাকেশের কাছে ভ্রমণ বলেই মনে হয়। বাবাকে ওরা তাই ভ্রমণবন্ধু বলে ডাকে।
গত বছর বড় ঈদে বাবা ওদের বিরাট গরু-ছাগলের হাট দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এবারের ঈদে বাঘের হাটে নিয়ে যাবে বলেছেন। কথাটি শোনার পর থেকে টেনশনে দুই ভাই-বোন ঘুমাতেই পারছে না। রাকেশ তো ভেবে অবাক বাঘের হাট হয় কেমন করে? আগের বছর ঈদের আগে সে মাইকে বলতে শুনতে পেয়েছে, বলছে—বিরাট গরু-ছাগলের হাট। কই! এবার তো বলতে শুনতে পেল না—বিরাট বাঘের হাট! তা-ও বাবা যখন বলেছে, নিশ্চয় বাঘের হাটও বসবে।
বাবা চলে যাওয়ার পর রাকেশ কল্পনা করে ওরা বাঘের হাটে প্রবেশ করেছে। চারপাশে এত এত বাঘ। সাদা বাঘ, কালো বাঘ, সোনালি বাঘ, মাল্টিকালার বাঘ, বাংলা বাঘ, কোরিয়ান বাঘ, চীনা বাঘ। চোখের সামনে এত এত বাঘ দেখে বোনকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আগের বছর গরুর হাটে হাঁটতে একটুও ভয় লাগেনি। এবার বাঘের হাটে হাঁটব ভাবতেই গা শিরশির করছে আমার।
বাঘ যদি কামড়ে দেয়?’
মৌ অভয় দিয়ে বলেছিল, ‘বাঘের এত্তো সাহস আছে নাকি আমি সঙ্গে থাকতে আমার ছোট্ট ভাইটাকে কামড়ে দেবে?’
এ রকম নানা কথাবার্তার মধ্যেই রাত চলে আসে। কিন্তু সকালে বাঘের হাটে যাবে ভেবে ঘুম আসছে না রাকেশের। মৌও চোখ মেলে শুয়ে আছে পাশে। বোনকে ঘুমাতে না দেখে রাকেশ ফের জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, ঈদে গরু, ছাগল, উট, মহিষ, ভেড়ার হাট হয়, কিন্তু সত্যি সত্যি বাঘেরও হাট হয়!’
মৌ বলল, ‘ওটা ঈদের বাঘের হাট নয়। অন্য। ওখানে বাঘ কেনাবেচা হয় পালার জন্য। দেখিস না মানুষ শখ করে বেড়াল পালে, কুকুর পালে; ওরকম।’
‘বাবা তাই বলেছে বুঝি?’
‘বাবা বলেনি, কিন্তু আমার তা-ই মনে হয়।’
‘আমার এবার সত্যি ভয় লাগছে! একটা বাঘ যদি হালুম বলে কামড়ে দেয় তখন কী হবে?’
‘দূর বোকা! ভয়ের কিচ্ছু নেই। বাবা সঙ্গে থাকলে আমাদের আবার ভয় কিসের!’
‘কিন্তু মানুষ বাঘ কেন পালবে? আর বাঘ পালার মতো অত সাহসই বা মানুষের হলো কী করে?’
‘মানুষের বাড়িতে যেন বাঘের ভয়ে চোর-ডাকাত ঢুকতে না পারে সে জন্য তারা বাঘ পালবে। শুনিসনি গতকাল পাশের বাসার আন্টি বলছিল তাদের বাড়িতে চোর ঢুকেছিল। সবকিছু চুরি করে পালিয়ে গেছে। তখন যদি আন্টির বাড়ির সামনে একটা বাঘ থাকত, বাঘ দেখে বাড়ির ভেতর ঢুকতে চোরের সাহস হতো নাকি? ভয়ে নিশ্চয়ই পালিয়ে যেত।’
‘কিন্তু সুন্দরবনে তো অনেক বাঘ আছে। বাঘের ভয়ে যদি চোর পালিয়েই যাবে, তাহলে সুন্দরবনে চুরি হয় কেমন করে? খবরে শোনোনি সুন্দরবনে সুন্দরীগাছ আর মধু চুরি হয়?’
‘এটা ভালো বলেছিস, ভাই। সকালে বাবা ঘুম থেকে উঠলে বাবাকে জিজ্ঞেস করব সুন্দরবনে চুরি হয় কেমন করে? এখন চল ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক রাত হয়েছে।’
‘না, তুমি ঘুমাও। বাঘের ভয়ে আজ সারা রাত আমার ঘুম আসবে না। তা ছাড়া আমার তো এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না বাঘের হাট হয়। ওই হাটে আবার মানুষ যায়!’
‘কেন বিশ্বাস হবে না? বাবা আমাদের কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবে বলেছে আর নিয়ে যায়নি এমন হয়েছে কখনো?’
‘তা হয়নি। তাহলে বলছ কাল সকালে আমরা সত্যি সত্যি বাঘের হাটে যাচ্ছি?’
‘হ্যাঁ! সত্যি সত্যি যাচ্ছি। এবার ঘুমাও।’
বোনের কথামতো রাকেশ ওপাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ বন্ধ করে রাখে। নাহ! বাঘের ভয়ে ঘুম পালিয়েছে। মনে হচ্ছে, ঘুমিয়ে গেলে এক্ষুনি একটি বাঘ এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে রাকেশের ওপর। তার চেয়ে বোনের সঙ্গে কথা বলা যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। পাশ ফিরে আবার প্রশ্ন রাকেশের, ‘আচ্ছা, বাঘের হাটে কারা বাঘ বেচতে আসে, কিনেই বা কারা?’
মৌ বলল, ‘ব্যাপারীরা বেচতে আসবে। কিনবে অনেক ধনসম্পদ আছে ওরকম মানুষেরা। ধনসম্পদ পাহারা দিতেই তারা বাঘ কিনবে।’
‘কিন্তু ব্যাপারীরা এত বাঘ পাবে কোথায়!’
‘এত কথা এখন বলা যাবে না। চল ঘুমিয়ে পড়ি, নইলে সকালে বাঘের হাটে গিয়ে ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু করবে।’
‘কিন্তু বাঘের ভয়ে ঘুমই তো আসছে না।’
‘না ঘুমালে কিন্তু এখন সত্যি সত্যি বাঘ আসবে। এসেই হুংকার দিয়ে বলবে—কী রাকেশ মিয়া! এত রাত হয়েছে, এখনো ঘুমাচ্ছ না কেন?’
‘বাঘ কথাও বলতে পারে?’
‘আর কথা বলিস না, ভাই। এই বুঝি আসছে একটা বাঘ।’
আর একটাও কথা বলেনি রাকেশ। টুপ করে ঘুমিয়ে পড়ল। পাশের ঘর থেকে ছেলেমেয়ের ফিসফিস কথা শুনতে পেয়ে ওদের বাবা উঠে আসে। মৌ জেগে আছে দেখে বললেন, ‘কী ব্যাপার, মা! এত রাত হলো, এখনো ঘুমাচ্ছ না কেন?’
মৌ বলল, সকালে বাঘের হাটে যাব, এত এত বাঘ দেখব ভেবে ভয়ে, আনন্দে, কৌতূহলে ঘুম আসছেই না, বাবা।’
বাবা বললেন, ‘ভয় কেন পাবে! আর আমরা বাঘ দেখব কে বলল তোমায়?’
‘এমা! বাঘের হাটে যাব বাঘ দেখব না, তা কী করে হয়, বাবা?
‘দূর বোকা! সেখানে আমরা দেখব সাত গম্বুজ মসজিদ, দুবলারচর, খাঞ্জেলী দিঘি, সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি, কুদলা মঠ, আরো কত কি! এখন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।’
বাবার কথা শুনে মৌয়ের চোখ ছানাবড়া। ও বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সাত গম্বুজ মসজিদ, দুবলারচর, খাঞ্জেলী দিঘি, সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি, কুদলা মঠ—এগুলো কোথায়, বাবা?’
বাবা বললেন, ‘কেন, বাগেরহাটে!’
Publisher & Editor