বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

পূর্ণিমা ও অচেনা রাজপুত্র

প্রকাশিত: ০৮:২৬, ১০ জুলাই ২০২৪ | ২৩

অনেক যুগ আগের কথা। নীলমণি রাজ্যের রাজ্যপতি ছিলেন রাজা জলধর কুন্তল। রাজ্যের সব কিছু দেখভালের জন্য ছিল শক্তিশালী জঠর সর্দার। জঠরের ভয়ে রাজ্যের কোথাও কেউ অন্যায় করতে পারত না।

প্রজারা জানে অন্যায় করলে এই খবর রাজার কানে পৌঁছবে, আর তাতেই সবার গর্দান যাবে। রাজ্যে শুধু সুখ আর সুখ। রাজ্যের আশপাশের বনবনানী পাখপাখালিতে মুখরিত। কত নদী।

সরোবর। উঁচু উঁচু পাহাড়। প্রজাদের বাড়ি বাড়ি ফুলের বাগান। বাগানে প্রজাপতির ওড়াউড়ি।

পাখির ডাকে সবার ঘুম ভাঙে। মাঠে সোনার ফসল ফলে। কারো কোনো অভাব নেই। জঠর সর্দারের ছিল এক কন্যা। নাম পূর্ণিমা।

দেখতে চাঁদের মতো। রাজ্যের অন্য মেয়েদের সঙ্গে পাঠশালায় পড়তে যেত। সব সময় হাসিখুশি থাকত। ওকে নিয়ে মা-বাবার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। জঠর সর্দারের মেয়ে বলে কথা। সবাই ওকে খুব আদর করত। কেউ কেউ পূর্ণিমাকে মিষ্টি মেয়ে বলে ডাকত। হঠাত্ ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দেয়। মন ভারী করে এক জায়গায় চুপটি মেরে বসে থাকত। জঠর সর্দার মেয়ের মন ভারীর কারণ খুঁজতে লাগল। কিন্তু মন খারাপের কারণ খুঁজে পেল না। পূর্ণিমা খাবার খেতে চাইত না। পাঠশালায় যেত না। মা-বাবার চিন্তা বাড়তে লাগল।
একদিন পূর্ণিমা কাউকে কিছু না বলে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে ঘোরাফেরা করতে লাগল। খুব আনন্দ পেল ও। বনে কত রকম ফল। পাখির কলকাকলি। পূর্ণিমা মনের খুশিতে ফল খায়। সময় কাটায়। একদিন ভোরবেলা পূর্ণিমা চোখ মেলে দেখে অনেক প্রজাপতি। আহা, কী সুন্দর! হঠাত্ দূর থেকে আলো ভেদ করে রাজকীয় পোশাকে এক রাজপুত্র পূর্ণিমার দিকে এগিয়ে আসে। সামনে এসে দাঁড়ায়। পূর্ণিমার চোখ ছানাবড়া। রাজপুত্র পূর্ণিমাকে বলে, কে তুমি?

আমি এই রাজ্যের জঠর সর্দারের কন্যা।

তা এখানে এত সকালে কী করছ?

ঘুরতে এসেছি। পাঠশালায় একটানা পড়ালেখা ভালো লাগে না। কিন্তু তুমি কে?

আমাকে তুমি আগে কখনো দেখোনি। আমি ভিন রাজ্যের রাজপুত্র। আমারও এক রাজ্যে দীর্ঘ সময় খুব বোরিং লাগে। তাই মাঝেমধ্যে অন্য রাজ্যে ঘুরতে বের হই।

এই জঙ্গলে?

এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে দেখি। তাই জঙ্গলে নেমে পড়ি।

রাজপুত্রের শরীর থেকে মোহনীয় সৌরভ ছড়াতে থাকে। জঙ্গলের পরিবেশ আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে। রাজপুত্রকে পেয়ে পূর্ণিমাও খুশি। দুজনে মিলে বনের মধ্যে ঘুরতে থাকে। কেউ ওদের বাধা দেয় না। পড়ার জন্য তাড়া দেয় না। সময়মতো খাওয়ার জন্য বলে না। ঘুমাতে যেতে বলে না। জঙ্গলের মধ্যে ওদের আনন্দে দিন কাটে। কেউ ওদের সন্ধান করে না। ঋতুর বদল হয়। গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা আসে। বনে কদম ফুল ফোটে। হরিণের হাঁটাচলা, ময়ূরের নাচ মুগ্ধ করে ওদের। এক সকালে ওরা ঘুম থেকে জেগে দেখে বনের মধ্য দিয়ে মুনি হেঁটে যাচ্ছে। ওরা ডাক দেয় তাকে। হঠাত্ মুনি অদৃশ্য হয়ে যায়।

পূর্ণিমা রাজপুত্রকে বলে, গেরুয়া পোশাক পরা লোকটি আমাদের ডাকে সাড়া দিল না কেন?

উনি কে, জানো?

না।

উনি মুনি।

উনার কাজ কী? উনি কেন একা একা চলে?

উনারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশে না। একা একা চলে। ধ্যানেই বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করে। যুগে যুগে মানুষের কল্যাণ কামনায় মগ্ন থাকে।

তাই?

হ্যাঁ। শুধু তা-ই নয়, মানুষ কিভাবে সমাজে ভালো পথে চলবে, শিশুরা মা-বাবার আদেশ-নিষেধ কিভাবে মেনে চলবে, তা-ও কামনা করে।

রাজপুত্র তোমার কি পড়ালেখা করতে ভালো লাগে?

হ্যাঁ।

তাহলে তুমি ঘুরে বেড়াও কেন?

বা রে, বেড়াব না! আমি তো পাঠশালায় পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে তবেই ছুটিতে বের হই। তুমি বুঝি এমনটা করো না?

করি। তবে...

তবে কী?

আমার পাঠশালায় যেতে ইচ্ছা করে না। এই যে বনজঙ্গল, প্রকৃতি, আকাশ-বাতাস এসব কি পড়ার অংশ নয়? পাঠশালায় একই পড়া বারবার পড়তে ভালো লাগে না।

তা ঠিক। তবে পাঠশালা থেকে একটি শিক্ষা সনদ অর্জন করতে হয়, যেটি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লাগে।

চোখের দেখা প্রকৃতি বুঝি কাজে লাগে না?

লাগে। আগে একাডেমিক। পরে অন্য সব। আমরা এখনো ছোট। অভিভাবকদের অনুমতির বাইরে কিছু করা ঠিক হবে না। তুমি বনের মধ্যে আছ কত দিন হলো? নিশ্চয়ই তোমার মা-বাবা খোঁজ করছে তোমার। তুমি বাড়ি ফিরে গেলে তারা খুব খুশি হবে।

তুমি ঠিকই বলেছ রাজপুত্র। মা-বাবাকে না বলে জঙ্গলে আসা ঠিক হয়নি।

আমি চলে গেলে তুমি কি জঙ্গলে থাকবে, রাজপুত্র?

না। আমিও ফিরে যাব মা-বাবার কাছে। আমি তো তাদের অনুমতি নিয়ে ঘুরতে এসেছি। সময়মতো রাজ্যে ফিরে যাব।

তোমার সঙ্গে কি আমার আর দেখা হবে?

অবশ্যই। কল্পনার রাজ্যে ডুব দিয়ে আমাকে খুঁজলেই পাবে।

তাহলে আমি আসি, রাজপুত্র।

এসো।

এই বলে পূর্ণিমা ওর রাজ্যে ফিরে যায়। রাজপুত্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পূর্ণিমার দিকে...।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor