বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

ঘুষ ফেরত দেওয়া সেই ইউএনও এবং আজকের মতিউর–ফয়সাল

প্রকাশিত: ০৭:০২, ২৯ জুন ২০২৪ | ৩৭

গত বছর একুশে বইমেলায় এ টি এম মহিউদ্দিন আহমেদ আমাকে একটি বই দিয়েছিলেন। বইটির নাম নলছিটির নয় মাস। তিনি ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে ওই উপজেলার ইউএনও (তখন টিএনও বলা হতো) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নলছিটি ঝালকাঠি জেলার একটি উপজেলা। 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রশাসনের যে ভয়াবহ দুর্নীতির খবর বের হয়ে আসছে, বইটিকে তার সূচনাও বলা যায়। বইটিতে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে, যা থেকে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের দুর্নীতি ও জনগণের করের অর্থের অপচয়ের চিত্র পাওয়া যায়। মহিউদ্দিন আহমেদ ২০১৫ সালে যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে যান।

এ টি এম মহিউদ্দিন নলছিটির ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর একদিন তাঁর এক সহকর্মী ইঞ্জিনিয়ার অফিসের দুটি ফাইল নিয়ে আসেন তাঁর সই নিতে। সঙ্গে হলুদ দুটি খাম। কাজের মোট বরাদ্দের বিপরীতে ১ শতাংশ হারে ইউএনওর ‘বখরা’। ২০ লাখ টাকার কাজ হলে ২০ হাজার টাকা পারিতোষিক। এটা পদ্ধতিগত ঘুষ। আগের ইউএনওরা নাকি এভাবেই নিতেন।

মহিউদ্দিন হলুদ খামের রহস্য ভেদ করতে সেখানে উন্নয়নকাজের সঙ্গে জড়িত সব ঠিকাদারকে ডাকলেন। তাঁরা ভাবলেন, নতুন ইউএনও সম্ভবত ১ শতাংশ উৎকোচে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা সন্তুষ্টির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতিও নিলেন।

কিন্তু এ টি এম মহিউদ্দিন বললেন, ‘আপনারা আমাকে “হলুদ খাম” দিচ্ছেন, সেটা কেউ পকেট থেকে দিচ্ছেন না। রাস্তা, সেতু, কালভার্টের কাজে যে ইট, বালু, সিমেন্ট দেওয়ার কথা, সেটা কম দেবেন।’ জবাবে ঠিকাদারেরা জানান, খাম না দিলে আগের ইউএনওরা ফাইল সই করতেন না। টালবাহানা করতেন।

এরপর মহিউদ্দিন সাফ জানিয়ে দিলেন, হলুদ খাম ছাড়াই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফাইল সই হবে। তবে ঠিকাদারেরা কাজে ফাঁকি দিলে, বিলম্ব করলে ফাইল সই হবে না। তিনি তাঁর এক আত্মীয় ঠিকাদারের কথাও লিখেছেন বইয়ে, যিনি এক ইউএনওর সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের পুরো টাকাই মেরে দিয়েছিলেন কোনো কাজ না করেই। এ টি এম মহিউদ্দিন লিখেছেন, স্কুল–মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিলেও ইউএনওর কমিশন ছিল। তিনি সেটাও বন্ধ করে দেন।

আগে মেধাবীরা বিসিএস ক্যাডারে প্রশাসন বা পররাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতেন। সাম্প্রতিক কালে কেন তাঁরা পুলিশ ও রাজস্ব বিভাগের দিকে ঝুঁকছেন, বেনজীর ও মতিউর–কাণ্ডে তার মাজেজা জানা যায়। উপজেলার একটি মাদ্রাসায় আকস্মিক পরিদর্শন করে ইউএনও দেখতে পান যে সেখানে কাগজপত্রে শিক্ষক আছেন ৩৪ জন। অথচ বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ ঘুরে তিনি শিক্ষার্থী পেয়েছেন ১৩ জন। ১৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৩৪ জন শিক্ষক! মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত বিধায় শিক্ষক–কর্মচারীরা সরকারি কোষাগার থেকেই বেতন–ভাতার বড় অংশ পান। 

এটাকে বলে পদ্ধতিগত দুর্নীতি। এই পদ্ধতিগত দুর্নীতি আছে সরকারের প্রায় সব বিভাগে। বিদ্যুৎ অফিস থেকে হাসপাতাল, এনবিআর থেকে পণ্য খালাসের বন্দর। 

সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, ‘আমরা কোম্পানির জন্য যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করি, তার প্রকৃত দাম দেখালে এনবিআর কর্মকর্তারা ছাড়পত্র দেন না। তাঁরা আন্দাজে একটি দাম ধরে শুল্ক নির্ধারণ করেন। উৎকোচ নেওয়ার এটাই কৌশল।

একই ঘটনা ঘটে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি পরিষেবা দপ্তরগুলোয়। বৈধ সংযোগে সঠিক বিল পরিশোধ করলেও গ্রাহকদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। কিন্তু অবৈধ সংযোগকারীদের কোনো সমস্যা হয় না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়তি অর্থ দিলে। এতে অবৈধ সংযোগকারী ও পরিষেবাকর্মীরা লাভবান হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও জনগণ।

সম্প্রতি পুলিশের সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদ, এনবিআরের সদস্য মতিউর রহমানের অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি দেখে ভেবেছিলাম, এগুলো ব্যতিক্রম। ব্যক্তি খারাপ হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো অতটা খারাপ হয়নি। কিন্তু পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন যেভাবে তাদের সাবেক কর্মকর্তার দায় নিজেদের কাঁধে নিল, তাতে এ কথা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে যে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। যখন শুনি ঢাকা শহর কিংবা পছন্দের থানায় পদায়ন পেতে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কোটি টাকা পর্যন্ত ‘খরচ’ করেন, তখন মনে হয়, দুর্নীতিটা প্রশাসনিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আগে মেধাবীরা বিসিএস ক্যাডারে প্রশাসন বা পররাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতেন। সাম্প্রতিক কালে কেন তাঁরা পুলিশ ও রাজস্ব বিভাগের দিকে ঝুঁকছেন, বেনজীর ও মতিউর–কাণ্ডে তার মাজেজা জানা যায়।

এনবিআরে মতিউর–কাণ্ডের পর প্রথম সচিব কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবরও বেরিয়ে এসেছে। নিজের পাশাপাশি এসব সম্পদ ফয়সালের স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাইসহ আত্মীয়স্বজনের নামে দেখানো হয়েছে।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার আদালত ফয়সাল ও তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে ৫ কাঠার দুটি প্লট, শ্বশুরের নামে থাকা ঢাকার রমনা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট, খিলগাঁওয়ে শাশুড়ির নামে ১০ কাঠা প্লট জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন।

সরকারের মন্ত্রীরা, আওয়ামী লীগের নেতারা সুযোগ পেলেই উন্নয়নের ফিরিস্তি দেন। হ্যাঁ, দেশে উন্নয়ন তো হচ্ছেই। তবে সেই উন্নয়নের সুফলটা কারা পাচ্ছেন, সে হিসাব তাঁরা দিচ্ছেন না। এত উন্নয়নের পরও তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এত উন্নয়নের পরও কয়েক কোটি কর্মক্ষম তরুণ বেকার জীবনযাপন করছেন। এত উন্নয়নের পরও ঢাকা শহরে ২০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বসবাস করেন। অনেকে ফুটপাতে, টার্মিনালে রাত কাটান। 

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে বেনজীর সাহেব, ছাগল-কাণ্ডের কর্মকর্তা কেন আইনকে ভয় পান? আইনকে ভয় পান মানে হচ্ছে তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেগুলো সত্য।’

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‍বিএনপি কখনো তাদের দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করতে পারেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় মন্ত্রী-এমপিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কামরুল ইসলামের যে মন্তব্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে, সেটি হলো, ‘আমরা রাজনীতি যারা করি, আমাদের লজ্জা হয় এসব দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক লুটেরার চিত্র দেখে।’

দুর্নীতি দেখে সত্যি সত্যি রাজনীতিকদের লজ্জা হলে দেশের অবস্থা এ রকম থাকত না। আওয়ামী লীগের আমলে যে দেশের উন্নতি হয়েছে, তার ছিটেফোঁটা সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন। সিংহভাগ সুফল গেছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, আইনের রক্ষক, মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, ক্ষমতাসীন দলের বড় ও ছোট নেতাদের ভাগে। 

যখন টিআইবি কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে দুর্নীতির কথা বলে, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলেন, ওসব অপপ্রচার। যখন দেশের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, তখনো তাঁরা বললেন, এই গবেষণার পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। আর যখন নিরীহ সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতির অতি খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তখনো সরকার বলে, ‘ওসব গুজবে কান দেবেন না।’ এখন গুজবটি তাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। কীভাবে সামাল দেবেন, সেটাই দেখার বিষয়।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor