বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

চীনকে ঠেকাতে ইউরোপের নতুন নেতাদের এক হতেই হবে

প্রকাশিত: ০৩:২৫, ২৫ জুন ২০২৪ | ৪২

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি শিগগিরই একটি নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে যাচ্ছে। উরসুলা ভন ডার লিয়েন ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার জন্য ভালো অবস্থানেই আছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল একজন নতুন প্রেসিডেন্ট ও একজন নতুন পররাষ্ট্রনীতি প্রধান পাচ্ছে। 

এই নেতারা ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান ও গাজায় চলমান ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয় নিয়ে কাজ করবেন। তবে যখন বৈশ্বিক ইস্যুতে ইউরোপের অবস্থান নির্ধারণের প্রসঙ্গ আসছে, তখন চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের ব্যাপারে ইউরোপ কী করবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

ইউরোপ একসময় আশা করত, চীন ধীরে ধীরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে আমাদের মূল্যবোধকে আত্মস্থ করে নেবে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সে আশা সুদূরপরাহত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপের ব্যবসা–বাণিজ্য যাতে মার খেয়ে যায়, সে জন্য চীন তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করে সস্তা পণ্য উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কথার অবাধ্য হওয়া ছোট দেশগুলোকে শায়েস্তা করতে তারা নিয়মিতভাবে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে প্রয়োগ করছে। 

এ ছাড়া ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মদদ দরকার, তা সমানে চীন দিয়ে যাচ্ছে। তবে তাইওয়ান প্রণালিতে চীন যে সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে, তা এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গত মাসে তাইওয়ানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই ‘সীমাহীন আশায় ভরপুর একটি চ্যালেঞ্জমুখর নতুন যুগ’কে স্বাগত জানিয়ে তাঁর উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছেন। এর কয়েক দিনের মধ্যে তাইওয়ান নামক এই দ্বীপরাষ্ট্রের চারপাশে বিশাল সামরিক মহড়া দিয়ে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাইয়ের ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। পুতিনের ইউক্রেন অভিযানের আগে ইউরোপ ‘সবচেয়ে ভালো কিছুর জন্য আশার ওপর ভর করার’ যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তা যে কতটা ভুল ছিল, তা এখন বোঝা যাচ্ছে। সি চিন পিংয়ের ক্ষেত্রে ইউরোপের একই ভুল করা মোটেই উচিত হবে না। 

যে বিষয়ে ভন ডার লিয়েনকে কৃতিত্ব দিতেই হবে, সেটি হলো তিনি চীনের ব্যাপারে তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি চীন ইস্যুতে ঝুঁকি এড়ানোর (তার মানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়) এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে অন্যদের ব্ল্যাকমেল করাকে প্রতিহত করার জন্য একটি ‘জবরদস্তি ঠেকানো ব্যবস্থা’ প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। 

বাজারে চীনা সস্তা পণ্যের দৌরাত্ম্য মোকাবিলা করার জন্য তিনি ইউরোপিয়ান নেতাদের নিজ নিজ দেশের কোম্পানিগুলোকে প্রচুর ভর্তুকি দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এক মাসব্যাপী তদন্তের পর ইউরোপিয়ান কমিশন চীন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। 

চীনের অর্থনৈতিক হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপ জোরালো ভূমিকা রাখলেও তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনা উসকানির বিষয়ে ইউরোপ এখনো বিভক্ত ও দুর্বল অবস্থানে রয়ে গেছে। 

বেইজিংয়ে আনুষ্ঠানিক সফরে ইউরোপের নেতারা ইউরোপীয় মূল্যবোধ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ইস্যুতে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক হিসাব–নিকাশকে প্রাধান্য দিয়েছেন। 

গত বছরের তাইওয়ান উত্তেজনার কথা উল্লেখ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ উদ্বেগজনকভাবে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যে সংকট আমাদের নয়, সে সংকটকে আমাদের নিজেদের ঘাড়ে টেনে আনা ঠিক হবে না।’ 

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গবেষণা সংস্থা রোডিয়াম গ্রুপ হিসাব–নিকাশ করে দেখেছে, তাইওয়ান প্রণালিতে সংঘাত বাধলে তা ২০ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ে যাবে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের সংকট প্রকারান্তরে ইউরোপেরও সংকট। 

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, প্রয়োজনে চীনের ওপর তার চেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া যেতে পারে। 

সি চিন পিংকে আজ যদি বন্দুকের নলের মুখে তাইওয়ানকে দখল করে নিতে দেওয়া হয়, তাহলে কানুনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়বে। বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার জায়গায় তখন এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যেতে পারে, যা প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor