সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪

মেঘের বাড়ি, মেঘের ঘর

প্রকাশিত: ০৩:৪৮, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ৬৩

বলো তো, মেঘেদের বাড়ি কোথায়? ভাবছ, আরে, এ তো খুব সহজ! মেঘের বাড়ি আকাশে। মেঘের আসল বাড়ি কিন্তু আকাশে নয়, পৃথিবীতে! কারণ পৃথিবী থেকেই মেঘের যত ছানাপোনা আকাশে গিয়ে জড়ো হয়। তারপর তরতরিয়ে বেড়ে ইয়াব্বড় মেঘ হয়ে যায়!

মেঘের বীজ

ভাবছ, মেঘের আবার বীজ হয় কী করে? হয়! হয়! গাছ যেমন বীজ থেকে জন্ম নেয়, মেঘও তেমনি বীজ থেকেই গুটি বাঁধে!
আগেই বলেছি, মেঘেদের বাড়ি আদতে আমাদের পৃথিবীতেই। জানোই তো, পৃথিবীর বেশির ভাগই হচ্ছে সাগর আর নদী দিয়ে ভরা।
ফলে সূর্যের তাপে এসব নদী, সাগর, এমনকি আমাদের আশপাশের মাটিতে মিশে থাকা পানিও অনবরত বাষ্প হতে থাকে। বাতাসে ভর করে সেগুলো চলে যায় আকাশে। আকাশে ভেসে থাকা বাতাস কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা। ফলে জলীয় বাষ্প আকাশে গিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসে জমতে শুরু করে টুকটুক করে।

তবে ইচ্ছা করলেই বাষ্প জমতে পারে না। জানোই তো, বাষ্প খুব হালকা। আকাশে গিয়ে তাই তিড়িংবিড়িং লাফাতে থাকে তারা। তখন একটি মজার কাণ্ড ঘটে! আকাশের বাতাসে ধুলার কণা, বালুর কণা আর লবণের মিহি দানা মিশে থাকে। এমনকি ফুলের রেণু ভেসে বেড়ায় ঘন হয়ে। জলীয় বাষ্পরা এসব কণার চারপাশে গিয়েই জড়ো হয়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের ঘিরে জমতে শুরু করে। বুঝতেই পারছ, মেঘেরাও ছোট ছোট কণা থেকেই জন্ম নেয়! হোক তা বালু, ধুলা বা ফুলের ছোট্ট রেণু!
 
গুলুগুলু সাদা তুলো মেঘ

নীল আকাশ, ঝকঝকে রোদ। এ সময় দেখলে মনে হয়, আকাশের এক পাশে তুলো মেঘের বস্তা যেন উপুড় হয়ে গেছে। পেটফোলা মেঘগুলো ইচ্ছামতো ওপরে উঠে যাচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে এদিক-ওদিক। কোনোটিকে লাগছে হাতির মতো, যেন শুঁড় বাড়িয়ে দিয়েছে ইয়াব্বড়! কোনোটি গুলুগুলু ভালুকছানা। দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছে আরেকটি মেঘের দলা! ইংরেজিতে এই মেঘকে বলে কমুলাস। এরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিচে থাকে। পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব মাত্র ছয় হাজার ৫০০ ফুট। রোদ বা গরমে পৃথিবী যখন অনেক জলীয় বাষ্প জমা করে, তখনই কেবল কমুলাস মেঘ তৈরি হয়। জলীয় বাষ্প জমে জমে তৈরি হয় তো, তাই এই মেঘের বেশির ভাগই ছোট ছোট কুয়াশার মতো পানির কণায় ভরপুর থাকে। ফলে এদের তোমরা খুব মিহি সাদা আর তুলতুলে দেখো!  শরৎকালে এই মেঘই আবার ছেঁড়া তুলোর মতো আকাশ ভরিয়ে রাখে! ফুরফুরে বাতাসে হালকা কমুলাস মেঘ বাতাসের সওয়ারি হয়ে ভেঙে ভেঙে ভাসতে থাকে আকাশজুড়ে!

পরিদের মেঘের মহল

একসময় কমুলাস মেঘ নিচ থেকে বাড়তে বাড়তে একেবারেই ওপরের দিকে উঠে যায়। তৈরি করে নানা ধাঁচের চূড়া। ওগুলোকে তখন আমরা ডাকি পরিদের প্রাসাদ বলে! এমন প্রাসাদ কিভাবে গড়ে ওঠে? ওপরের তাপমাত্রা নিচের তাপমাত্রা থেকে বেশ কম হয়। ফলে কমুলাস মেঘের নিচ থেকে বাতাস ওপরের দিকে উঠতে থাকে। সেই বাতাসেই মিশে থাকে মেঘের সাদা সাদা কুয়াশার গুঁড়া। এভাবেই ওপরে উঠতে উঠতে গড়ে ওঠে সাত মহলা মেঘের বাড়ি! তবে সন্ধ্যা হতেই মিলিয়ে যায় ওরা। আদতে ওরা চলে যায় তখন মধ্য আকাশে।

টলমল খুব কালো মেঘ

একসময় ওপরের ঠাণ্ডা বাতাসে মেঘের চূড়ায় থাকা পানির কণাগুলো জমতে জমতে বড্ড ভারী হয়ে যায়। আর বড় হতে হতে নিজের ভারই সইতে পারে না। ঝরে পরে টুপটাপ। তখন মেঘের রং হয়ে যায় কালো। আর মেঘের নামটিও হয়ে যায় নিম্বোস্ট্র্যাটাস! জানো, নিম্বোস্ট্র্যাটাস মানেই বৃষ্টির মেঘ! আকাশের ছয় হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ফুট উঁচুতে থাকে।

ভেজা ভেজা লেজতোলা মেঘ

আকাশের অনেক ওপরে থাকে যে মেঘ, তার নাম সাইরাস। একে আমরা আদর করে ডাকি লেজতোলা মেঘ বলে। কারণ আকাশের ওপরের দিকে ঠাণ্ডা বেশি হয় বলে সেখানকার মেঘে কোনো পানির কণা থাকে না। এর বদলে চকচকে মিছরির দানার মতো বরফের কুচি জমে জমে মেঘ তৈরি হয়। সে জন্যই দেখবে, আকাশের অনেক উঁচুতে থাকা মেঘগুলো কেমন ছেঁড়া ছেঁড়া আর সরু চিকনচাকন হয়। পাখির লেজের মতো দেখতে। আকাশের সবচেয়ে উঁচুতে আরেক ধরনের মেঘ আছে। চাঁদের চারপাশ ঘিরে তোমরা যে মেঘটিকে দেখতে পাও, ওটিই! নাম সাইরোকমুলাস।

মেঘের লড়াই

মেঘের লড়াই হয় ভীষণ রকম। দাপাদাপি আর গর্জন শোনা যায় থেকে থেকে। জানো, মেঘেরাও কিন্তু লড়াই করে! শব্দটিও হয় কান-ফাটানো! লড়াই না বলে একে কুস্তিও বলতে পারো! মেঘেদের মধ্যে সবাই এমন কুস্তি লড়তে ভালোবাসে। তবে কমুলোনিমবাস মেঘ একটু বেশিই দস্যি। যেই না একটু দশাসই হয়ে যায়, অমনি কুস্তি লড়তে শুরু করে দেয়। কমুলোনিমবাস মেঘের ওপরের দিকে থাকে বরফের মিহি কণা। আর নিচের দিকে থাকে ছোট ছোট পানির কণা। 

নিচের বাতাসে তাপমাত্রা বেশি থাকে বলে নিচের মেঘগুলো জোর বেগে ওপরের দিকে উঠে যায়। ওদিকে মেঘের ওপরে বাতাস ঠাণ্ডা হয় বলে ওপরের মেঘটুকু নিচের দিকে ধেয়ে আসে। ফলে মাঝপথে ঠাণ্ডা মেঘের বরফের কণা আর গরম মেঘের পানির কণার মধ্যে তুমুল এক ধাক্কা লেগে যায়। ফলে মেঘের দুই পাশে দুই ধরনের চার্জ জমা হয়!

ওপরের মাথাটি হয়ে যায় প্লাস আর নিচেরটি মাইনাস। ওদিকে পৃথিবীর মাটি আর গাছপালার চার্জ হচ্ছে প্লাস। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, প্লাস আর মাইনাস চার্জ একে অপরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে মেঘের নিচের দিকে যখন অনেক মাইনাস চার্জ জমা হয়ে যায়, পৃথিবীর মাটি বা গাছের প্লাস চার্জ তাকে নিজের দিকে টেনে আনে। ফলে প্রচণ্ড আলোর বিজলি ধেয়ে আসে মেঘ থেকে। আবার কখনো কখনো একটি প্লাস চার্জের মেঘ আর একটি মাইনাস চার্জের মেঘও একে অপরকে নিজের দিকে টেনে আনে। ফলে বিশাল জোরে ধাক্কা লাগে একটির সঙ্গে আরেকটির। ছলকে বেরিয়ে আসে বিদ্যুতের শিখা। আর একটু পরই আমরা শুনতে পাই কান-ফাটানো শব্দ!

তথ্যসূত্র : ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক
সায়েন্সইনস্কুল.অর্গ, নাসা

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor