বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচতে এক হতে চায় ইউরোপ

প্রকাশিত: ০৬:২৯, ১৫ মে ২০২৪ | ২৪

রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর থেকে ইউরোপীয়দের ভাবনাচিন্তায় যে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদেক সিকোরস্কির সাম্প্রতিক বক্তৃতা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

মাখোঁর মৌলিক বার্তাকে জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ সমর্থন করার সঙ্গে সঙ্গে আরও বোঝা যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আরও গতিশীল ও সুসংহত পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটা শুরু করতে পারে।

মাখোঁ নিজেও পরিবর্তনের পথে অনেক দূর এগিয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ন্যাটোর ‘মস্তিষ্কের মৃত্যু’ (ব্রেইন ডেথ) ঘটছে। সে সময় তিনি ইউরোপের জন্য এমন একটি স্বনির্ভর বৃহত্তর কৌশলনীতি ঠিক করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা সরাসরি মার্কিন নীতিকেও (এবং সেটি শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নয়) চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে। সে সময় অনেকেই মাখোঁর বক্তব্যকে ভুল বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই ‘ভুল’ই শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক পরিণতি বয়ে আনছে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে ন্যাটোর বেশির ভাগ ইউরোপীয় সদস্য ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সরদার হয়ে আছে। তাদের এই নিরস্ত্র দশা ইউরোপকে অরক্ষিত জায়গায় নিয়ে এসেছে।

এ কারণে মাখোঁর বক্তব্যের সমর্থনে বলা যায়, ইউরোপের অনেক আগেই প্রতিরক্ষা ইস্যুতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখার দরকার ছিল।

২০১৪ সালে অভিযান চালিয়ে রাশিয়ার ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখলের (ক্রিমিয়া) ঘটনা ন্যাটোকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ন্যাটোতে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে এবং বেশ কিছু পদক্ষেপ এই সামরিক জোটটিকে পরিবর্ধনের দিকে নিয়ে গেছে।

ইউরোপ এখন তার নিজস্ব যৌথ প্রতিরক্ষানীতি তৈরি করতে শুরু করেছে। তারা সামষ্টিকভাবে অস্ত্র কিনছে এবং আগের চেয়ে বেশি দক্ষতার সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সামরিক বিষয়গুলো সমন্বয় করছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে, তার সঙ্গে মিল রেখে ইউরোপ ইউক্রেনকে এ ধরনের সহায়তা দিতে শুরু করেছে।

মাখোঁর সর্বশেষ বক্তৃতার মূল বার্তাটি ছিল খুব স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ইউরোপ নশ্বর। এর মৃত্যু ঘটতে পারে।’ এর আগে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইউরোপ এখন ‘যুদ্ধ-পূর্ব যুগে আছে’ বলে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে মাখোঁর বার্তা অনুরণিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

বেশ কিছুদিন থেকে ফ্রান্স-জার্মান সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। তবে সেই সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মাখোঁর বক্তৃতার পরপরই ওলাফ শলৎজ এক্স পোস্ট করেছেন, ‘ফ্রান্স ও জার্মানি উভয়ই চায় ইউরোপ তার শক্তিকে অটুট রাখুক।…আমরা একসঙ্গে ইইউকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে। ইউরোপ দীর্ঘজীবী হোক!’
এ ছাড়া ইউরোপকে মাখোঁ লিসবন থেকে ওদেসা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সাধারণ উদার-গণতান্ত্রিক প্রকল্প হিসেবে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে বোঝা যায়, ইউক্রেনের ইইউর চূড়ান্ত সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে তাঁর দৃঢ় সম্মতি আছে। ইউরোপ এখন শুধু যে নিরাপত্তা হুমকিতে (রাশিয়ার দিক থেকে) আছে তা নয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সুরক্ষাবাদী শিল্পনীতি এবং অন্যান্য কারণে ইউরোপের সমৃদ্ধির বিষয়টিও হুমকির মুখে পড়ে গেছে।

হয়তো সেদিক বিবেচনায় রেখে মাখোঁ কয়েকটি বৈপ্লবিক প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ প্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে এবং ইইউ বাজেট দ্বিগুণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

বেশ কিছুদিন থেকে ফ্রান্স-জার্মান সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। তবে সেই সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মাখোঁর বক্তৃতার পরপরই ওলাফ শলৎজ এক্স পোস্ট করেছেন, ‘ফ্রান্স ও জার্মানি উভয়ই চায় ইউরোপ তার শক্তিকে অটুট রাখুক।…আমরা একসঙ্গে ইইউকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে। ইউরোপ দীর্ঘজীবী হোক!’

গত ২৫ এপ্রিল পোলিশ পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তৃতায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদেক সিকোরস্কি বলেছেন, ‘ইউনিয়নকে অবশ্যই অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সমান একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি হতে হবে।’ তিনি বলেন, পোল্যান্ড এবং পোল্যান্ডের জনগণ ইউরোপকে এক ছাতার তলায় আনার প্রক্রিয়ার অন্যতম নেতা হওয়ার যোগ্য।

মাখোঁ ও সিকোরস্কির বক্তৃতার সুরের মধ্যে মিল থাকার অর্থ হলো, পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি অবশেষে তার নিকটতম মিত্রদের সারিতে ফিরে এসেছে।

আজ ইউরোপের দেশগুলোর সামনে প্রধান হুমকি হলো রাশিয়া। এই হুমকিই ১৯৯১-পরবর্তী ‘ভাইমার ত্রয়ী’কে (ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ড) আবার সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করছে। তবে এটি নেহাত আঞ্চলিক বা প্রতীকী জোট হলে হবে না; বরং এটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ইঞ্জিনে পরিণত হতে হবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor