শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪

দুটি গল্প

প্রকাশিত: ০২:৪২, ০২ এপ্রিল ২০২৪ | ১৯

সূর্যহারা রোদের মৃত্যু

তখনো বাতাস বৃষ্টিভেজা পালকের মতো কুয়াশার বুকে সেঁটে। ট্রেন আসতে এক ঘণ্টা। স্টেশনের বেঞ্চে বসে নীলিমা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল সূর্যহারা রোদের মৃত্যু।

পাশে বসা বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি খুব কষ্ট? নীলিমা, হুম। বৃদ্ধ চুপচাপ। মিনিটখানেক পরে বললেন, যদি তুমি হালকা বোধ করো, তবে আমায় বলতে পারো।
নীলিমা একটা লম্বা শ্বাস নিল।

আমার হাজবেন্ড সাংবাদিক ছিলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতাম। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম চার বছর আগে। তিনি ছিলেন সৎ।

৫ নভেম্বর ২০২৩। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। রাতের ভেতর গভীর রাতের কান্না। আকাশ কেমন যেন মুষড়ে পড়ছিল আমার ওপর। বিচলিত করে তুলছিল বারবার।

আমি এশামকে কল দিই। সুইচড অফ। কিছুক্ষণ পর পর কল দিতে থাকি। কিন্তু মোবাইল অফ। নির্ঘুম রাত। সকাল হতেই তার মায়ের কাছে ফোন দিলাম। বললেন, এশাম তো এখানে আসেনি। পরিচিত সব ঠিকানায় খোঁজ নেওয়া হলো। কোনো খবর পাওয়া গেল না। অবশেষে থানায় জানালাম।

৮ নভেম্বর থানা থেকে ফোন এলো। ওসি সাহেব জানালেন, এশামের লাশ পাওয়া গেছে।

চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালে। খুব দুর্বল ও অসুস্থ বোধ হচ্ছিল। একজন নার্স মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষীণস্বরে বললেন, আপনার অ্যাবরশন হয়েছে। আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়ল না। অনেকটা বোধহীন হয়ে রইলাম। পরদিন শ্বশুর- শাশুড়ি আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে গেলেন।

ধীরে ধীরে চেনা পৃথিবী কেমন অচেনা হয়ে গেল। কাছের মানুষগুলোর ছায়া হালকা হতে হতে ঘোলা হতে শুরু করল। এসব পরিবর্তন দেখে বিষণ্ন ব্যামোয় আক্রান্ত হলাম। একসময় তাঁরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।

নীলিমার চোখ দুটো নির্বিঘ্নে কুয়াশা ভেদ করে গভীরে চলে গেল।

বৃদ্ধ বললেন, তোমার পরিবারে কে কে আছেন?

নীলিমা, কেবল অসুস্থ বাবা।

বৃদ্ধ বললেন, তিনি কোথায়? এমন সময় ট্রেন এলো। নীলিমা উঠে দাঁড়াল। বলল, বাবা এসো।

বৃদ্ধ, বললে না, তোমার বাবা কোথায়?

নীলিমা বৃদ্ধের হাত ধরে বলল—চলো বাবা, ট্রেন এসেছে!

বার্ধক্য-

কেউ কচি সবুজ ঘাস আনছে তো কেউ খুদি চালের নরম ভাত। নীরেনের দুধেল লাল গাইটার যত্ন-আত্তির শেষ নেই। রোজ ১২ কেজি দুধ দেয়। যা বিক্রির টাকায় নীরেনের সংসার চলে। মা লক্ষ্মীর মতো নীরেনের পরিবারে সুখদুঃখের সাথি হয়ে থাকে লালী।

ইন্দু আজ খুব খুশি। ভাই রমনকে নিয়ে বাজারে যাবে নতুন জামা কিনতে। কিন্তু নীরেন এখনো দুধ বিক্রি করে বাড়ি ফেরেনি। বাবা এলো বলে দুজনেই বারবার উঁকি দিচ্ছে রাস্তার দিকে। ইচ্ছে করছে মন পাখা লাগিয়ে এখনই উড়ে যায় ইন্দু। চপলা বাচ্চাদের এমন উৎকণ্ঠা লক্ষ করে ঠোঁট টিপে হাসে। বলে, কিরে তর সইছে না।

তক্ষুনি নীরেন ফিরল। বাচ্চারা তাকে জড়িয়ে ধরল। নতুন কাপড় কেনার পর বাচ্চাদের সেকি আনন্দ। একে-ওকে না দেখালেই নয়।

রাতে সবাই খেতে বসেছে। চপলা নীরেনকে বলল, ওগো, আমার কত দিনের শখ এক জোড়া কানের দুল কিনব। তুমি যা-ই বলো, এবার কিন্তু ছাড়ছিনে। নীরেন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে একবার নীরেনের পা ভাঙল। অপারেশন করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। লালীর দুধখাওয়া বাছুরটা বিক্রি ছাড়া উপায় রইল না। দালাল (ক্রেতা) যখন বাছুরটিকে নিয়ে যায় লালীর দুচোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরতে থাকে। সেই সঙ্গে ইন্দু ও রমনের আবেগাশ্রু চুয়ে চুয়ে পড়ে।

নীরেন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে। লালীর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, দেখিস কোনো দিন তোর অযত্ন হতে দেব না। লালী সেদিন নীরেনের অসহায়ত্বের কাছে তার মমত্ব বিসর্জন দেয়।

একসময় লালী থেকে গোয়াল ভর্তি হলো। ভিটে, পাকা ঘর, জমি সবই হলো।

বয়সের ভারে লালী আজ বড় ক্লান্ত। ঠিকমতো উঠে দাঁড়াতে পারে না। দুধ দেয় না, বাছুর দেয় না। এখন আর কেউ লালীর যত্ন নেয় না। আদর করে তার কষ্ট মুছে দেয় না।

ইন্দু, রমন আজ মস্তবড় অফিসার। বাড়ি এলে লালীর কথা মনেও করে না। তাকে জড়িয়ে ধরতে তাদের রুচিতে বাধে। লালী যেন বাড়ির বোঝা হয়ে পড়ে থাকে।

পাশের বাড়ির তিনতলায় থাকেন অবসরপ্রাপ্ত সোবহান সাহেব। হুইলচেয়ারে বসে রোজ জানালা দিয়ে লালীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। আর কী যেন ভাবেন!

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor