শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪

কাজের সঙ্গে নিতে হবে মনের যত্ন

প্রকাশিত: ০২:৩৮, ০২ এপ্রিল ২০২৪ | ১৫

অহনা, সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি শেষ করে কর্মজীবনে পা রেখেছে। একটি বেসরকারী ব্যাংকে নির্বাহী হিসেবে কাজের জন্য সেই সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে বের হয় অহনা। আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে হয়ে যায় রাত ১০টা। এর মধ্যে কাজের চাপে দুপুরের খাবারের কথা তো অনেক দিনই ভুলে যায়।

কাজের চাপে বিষন্নতা থেকে শুরু করে রাতে ঘুম না হওয়ার মত নতুন সংকট এসেছে তার জীবনে। হুট করে জীবনে এমন ছন্দপতনকে কিভাবে মানিয়ে নেবে অহনা? শুধু অহনা নয় যেকোনো ব্যক্তিরই যতই কাজের চাপ থাকুক না কেন নিতে হবে মনের যত্ন। 

অনেক কাজ, অনেক চাপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী আমাদের দেশে মোট শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ। তাদের মধ্যে কেউ ব্যবসা,  কেউ  চাকুরি, আবার কেউ গৃহস্থালি পর্যায়ের কাজ বেঁছে নিয়েছেন।

দিনের অনেকটা সময় এই বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর কর্মব্যস্ততায় কেটে যায়। একারণে অনেকেই শরীরের যত্ন নিতে ভুলে যান।  যেকোনো ধরণের রোগের হবার আগে তার প্রতিরোধ করাটাই রোগমুক্ত থাকার প্রথম উপায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাঁড়াতে করতে একজন মানুষের  নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার অধিকতর কার্যকর।

একটা বয়সের পর আমাদের মেটাবলিজমের মাত্রা কমে যায়। সেক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থকর খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতেহবে। সতর্কতা অবলম্বন করলেই সুস্থ থাকা অধিকতর সহজ হয়ে যায়। রোগ আক্রান্ত হবার পর যেকোনো চিকিৎসা অতিরিক্ত ব্যয় বহুল এবং রোগীর জন্য সেটি শুধু আর্থিক ভাবে নয়, শারীরিক এবং মানসিক ভাবেও বেশি কষ্টকর, সেই সাথে কমে যায় জীবনের প্রাণশক্তি। এই বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে  নিয়মিত চেকআপ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনেকটাই সাহায্য করতে পারে।

একমাত্র একজন  সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান কর্মজীবী ব্যক্তি তার কাজটি নিপুণ ভাবে শেষ করতে সক্ষম। যা তার ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, কর্মসংস্থান এবং দেশের উন্নয়ন বয়ে আনতে পারে। 

কাজের চাপে তৈরি হয় অসুস্থতা
কর্মজীবীরা কাজের চাপে বিভিন্ন রোগের সম্মুখীন হতে পারেন। অনেকেই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন না তবে দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা, সময় মতো খাবার এবং পানি না খাওয়া, ধূমপান অথবা চাপযুক্ত পরিবেশের জন্য প্রধাণ ভাবে দায়ী। এছাড়াও  নিয়মিত ব্যায়াম না করা বা হাই-কোলেস্টেরল  যুক্ত এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস রোগ আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে থাকে। তা থেকে হতে পারে বিশেষ করে হাইপার টেনশন, ডায়বেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ এবং পিটিএসডি, ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনের মতো মানসিক রোগ। কিছু গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মধ্যে (৫৭.৯%) হতাশা, (৫৯.৭%) চাপ এবং (৩৩.৭%) দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকেন। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত কাজের চাপের ফলে অনেক কর্মজীবীই  তার পরিবারে, বন্ধুমহল ও সহকর্মীদের সাথে সঠিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। তাই কর্মসংস্থান এবং যেকোনো প্রতিষ্ঠানের খেয়াল রাখা উচিত সেখানে কর্মরত ব্যক্তি সকল যেন তাদের নূন্যতম কাজ ও জীবনের সমন্বয় রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।

কর্মজীবী নারীর যত চাপ 
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কর্মজীবী নারীরা আরো বেশি  চাপের সম্মুখীন হন। পুরুষের পাশাপাশি শুধু যে পেশাগত ব্যস্ততার ভুক্তভোগী  হন তা নয়, এর পাশেপাশি অধিকাংশ নারীরই পরিবার এবং সমাজের একটা অতিরিক্ত বাধার সম্মুখীন হতে হয়। একজন পুরুষ হয়ত অফিস শেষ করে বাসায় যেয়ে বিশ্রাম করার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক অবকাঠামোগত অবস্থার  জন্য নারীরা অধিকাংশেরই অফিস শেষ করে পরিবারিক দায়িত্ব, সন্তানের যত্ন, ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকছেন। যার কারণে আরো বেশি মাত্রায় নিজের যত্ন এবং বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের সুবাতাস হয়ত বইছে কিন্তু এখনো ঘরে ঘরে কর্মমুখী নারীদের জন্য একটি সুন্দর এবং সাপোর্টিভ পরিবেশ গড়ে ওঠেনি।  

তরুণদের সুস্বাস্থ্য
যেকোনো দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি সে দেশের তরুণ প্রজন্ম। তারাই সমাজের ভবিষ্যত এবং উন্নয়নের প্রধান উপজীব্য। তারা আগামীর নেতা, বিজ্ঞানী, এবং বুদ্ধিজীবী। তরুণদের উচিৎ এখন থেকেই স্বাস্থ্যের  দিকে খেয়াল রাখা।  সুস্বাস্থ্য মানে শুধু শারীরিক সুস্থতা বোঝায় না। সুস্বাস্থ্য বলতে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ও আত্মিক সুস্থতাও বোঝানো হয়। সেক্ষেত্রে করণীয় কি কি হতে পারে?  নিয়মিত ব্যায়াম বিশেষ করে শারীরিক কসরত যুক্ত খেলাধুলা যেমন ক্রিকেট, টেনিস অথবা সাতার কাটা। পুষ্টিযুক্ত খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি খাওয়া। সাথে প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম। খেয়াল রাখতে হবে সেটা যেন রাতের ঘুম হয় এবং নুন্যতম ছয় ঘন্টা।  আরো কিছু কিছু ছোটো অভ্যাস পরিবর্তন যেমন,  প্রতিদিনের কাজের পাশাপাশি ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়া, স্ক্রিনটাইম কমানো, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি থেকে দূরে সরে আসার জন্য মাসে একবার ডোপামিন ডিটক্স এবং নিয়মিত  মেডিটেশনের চেষ্টা করা। এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া। ধূমপান এবং যেকোনো নেশা হতে দূরে থাকা, সেই সাথে একটি ভালো সাপোর্ট সিস্টেম যেমন  বিশ্বস্ত, ভালো বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor