শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪

ভেজাল ওষুধে বিপন্ন জীবন

প্রকাশিত: ০৫:২৫, ০১ এপ্রিল ২০২৪ | ১৭

জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ করে জীবন বাঁচাতে আমরা ওষুধ সেবন করি। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল। ফলে বিপন্ন হচ্ছে আমাদের জীবন। অথচ সর্বত্র ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই মিলছে ভেজাল ওষুধ। আর এ কাজটিতে সহযোগিতা করছে কিছু অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী। তারা বেশি মুনাফার প্রত্যাশায় ভেজাল ওষুধ তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে। কিন্তু এগুলো চেনার উপায় নেই। দেখতে হুবহু ‘আসল’ মোড়কে গ্যাস্ট্রিক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের হুবহু আসল ওষুধের মতোই। ফলে ক্রেতাদের পক্ষে কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা পরখ করা কঠিন। বাজারে পরিচিত ওষুধ কোম্পানির ওষুধগুলোই বেশি নকল করা হয় যেন ক্রেতারা ধরতে না পারে। নকল ওষুধ বাজারজাতকরণ চক্রকে কিছু অসাধু মুনাফালোভী ফার্মেসি সহযোগিতা করছে। ফলে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী ওষুধের সুনাম থাকলেও ভেজাল ওষুধের রমরমা বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না। যেসব ওষুধ সঠিক নয় বা সঠিক কাঁচামাল দিয়ে তৈরি নয় কিংবা অপরিমিত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি করা হয় সেটাই নকল ওষুধ। নকল ওষুধে লাভ বেশি হয়। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে নকল ওষুধ ক্রয় করে বেশি দামে বিক্রি করে। নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন বাজারজাতকরণ হত্যার শামিল। অথচ জেনেশুনেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জঘন্যতম কাজটি প্রকাশ্যে করে যাচ্ছেন। একজন খুনি একজন মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু নকল ওষুধ উৎপাদনকারী পুরো মানবজাতিকে হত্যা করছে। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির অন্যতম আখড়া হিসেবে মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকা সর্বাধিক পরিচিত। এখান থেকেই সারা দেশে ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু অসাধু চক্রকে ধরা যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ওষুধ রফতানির একটি সুনাম আছে। বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ এখন বিশ্বের ১০৬টি দেশে রফতানি হচ্ছে। বিশ্বের ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের নামী-দামি ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি হওয়ায় সম্ভাবনাময় এ খাতটি যেকোনো সময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।

ওষুধ আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছর শাস্তি এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান মৃত্যুদণ্ডের রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উক্ত দুটো আইনে নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য কেউ শাস্তি পেয়েছেন এমন নজির স্থাপিত হয়নি। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। কিন্তু জরিমানা পর্যন্তই শেষ। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও অসাধুচক্র তদন্তকারী কর্মকতাদের ম্যানেজ করে ফেলে। ফলে বন্ধ করা যাচ্ছে না নকল ও ভেজাল ওষুধ বিতরণ। এ ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের নজরদারি আরো বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে তাদের জনবল বাড়ানো এবং তাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও নিরাপদ ওষুধ অত্যন্ত জরুরি। টেকসই জীবন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ খাদ্য ও নিরাপদ ওষুধের বিকল্প নেই। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। সুতরাং এ সমস্যার সমাধানকল্পে দেশব্যাপী মডেল ফার্মেসির সংখ্যা বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে মডেল ফার্মেসি গড়ে তোলা প্রয়োজন। নকল ওষুধ প্রতিরোধে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে বাজারজাতকরণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। নকল ওষুধের রুট সবার আগে বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। ভেজাল ওষুধের অন্যতম রুট হচ্ছে, রাজধানীর বাবুবাজার, মিটফোর্ড এলাকাসহ সারা দেশের কিছু পাইকারি ওষুধ বাজার। সেখান থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে ও অনলাইনে কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্রেতার কাছে নকল ওষুধ পাঠিয়ে দিচ্ছে। গাঁও-গেরামের ফার্মেসি থেকে শুরু করে রাজধানীর কিছু নামকরা ফার্মেসিতেও নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়। ফলে সাধারণ মানুষ কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা শনাক্ত করতে পারে না।

কারণ অধিকাংশ ফার্মেসি ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ দিয়ে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব কোম্পানির ওষুধ নিষিদ্ধ সেগুলো ওষুধের দোকানে টাঙিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভেজাল ওষুধ বিক্রি করার অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি বৈধ সনদধারী ফার্মাসিস্ট থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন যেন ব্যাঙের ছাতার মতো ফার্মেসি গড়ে উঠা বন্ধ হয়। এ শিল্পের বিকাশমান উন্নয়নকে ধরে রাখতে হলে নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই। ওষুধে ভেজালে শাস্তি শুধু জেল-জরিমানার মধ্যে সীমিত না রেখে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন যেন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়। সুতরাং গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর জন্য দেশের ওষুধ শিল্পের সর্বনাশ যেন না হয় সে দিকে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেয়া প্রয়োজন।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor